ইংরাজীতে গবেষণার প্রতিশব্দ হল Research, অর্থাৎ Re-র অর্থ পূনঃ এবং Search র অর্থ অনুসন্ধান। যার বাংলায় মূল অর্থ পুনরায় অনুসন্ধান করা বা পুনরনুসন্ধান। গবেষণা বিষয়ে Research শব্দটি বাংলায় অধিক প্রচলিত একটি বাচন। এর সমর্থক শব্দ হল জিজ্ঞাসা প্রদত্ত অনুসন্ধান, বিকিরন এবং নিরুপন। পুনরনুসন্ধান অথবা গবেষণা যাই-ই ব্যবহার করা হোক না কেন যার মূল উদ্দেশ্য সত্যের অনুসন্ধান। অর্থাৎ গবেষণা হল সত্য অনুসন্ধানের বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়া, যার সাধারন অর্থ হল ‘সত্য’ (Truth) ও ‘জ্ঞান’ (Knowledge) -এর অনুসন্ধান । অন্যভাবে বলা যায়, গবেষণা হল তুলনামুলক উন্নত পর্যবেক্ষন করা, ভিন্ন প্রেক্ষিতে খোঁজা এবং বাড়তি জ্ঞানের সংযোজন করার সুশৃংখল ব্যবস্থা। কোনো নির্দিষ্ট বিষয় সম্পর্কে প্রাসঙ্গিক তথ্য সংগ্রহের জন্য যথা সম্ভব অভিজ্ঞতাবাদী অথবা বৈজ্ঞানিক ও সুসংবদ্ধ অনুসন্ধান হল গবষণা। সার্বিক ভাবে বলা যায় গবেষণা হল কোনো নির্দিষ্ট বিষয়ের ব্যাপক উন্মুক্তকরন এবং কঠোর সুসংবদ্ধ অনুসন্ধান।
গবেষণা যতটা সম্ভব বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে তথ্য অনুসন্ধানের এক প্রক্রিয়া। ইংরেজিতে RESEARCH শব্দটি একইসঙ্গে কতগুলি শব্দসমষ্টি বহন করে। যেমন:
R-Rational of thinking
E-Expert and Exhaustive treatment
S-Search for solution
E– Exactness
A– Analytical analysis of adequate data
R-Relationship of facts
C– Careful recording, critical observation, Constructive attitude
H– Honesty, Hard work.
RESEARCH শব্দটি এরূপ পূর্ণাঙ্গ ধারণা পাওয়ার পর গবেষণার একটি সম্যক ধারণা সম্পর্কে অবহিত হতে পারি। The Advance Learner Dictionary of Current English এ গবেষণার সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে তা হলো “জ্ঞানের যে কোন শাখায় নতুন তথ্য সংগ্রহের জন্য ব্যাপক ও সযত্ন তথ্যানুসন্ধানই হল গবেষণা” (A careful investigation or inquiry specially through research for now facts in any branch of knowledge)। রেডম্যান এবং মরির মতে “ নতুন জ্ঞান আহরণের সুসংবদ্ধ চেষ্টা-প্রচেষ্টা হল গবেষণা”। রাস্কের মতে, গবেষণা একটি বিশেষ অভিমত যা মানুষ কাঠামোর অনুসন্ধিৎসু দৃষ্টিভঙ্গি, গবেষণা যেসব প্রশ্নের অবতারণা করা যা এর উদঘাটন আগে কোনও দিন হয়নি এবং গবেষণার মাধ্যমে সেই সব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পাওয়া যায়। গ্রিনের কথায়, জ্ঞান অনুসন্ধানের আদর্শিত বা মানসম্মত পদ্ধতির প্রয়োগই গবেষণা। ফালদালীন-এর মতে উপস্থিত জ্ঞানের প্রকৃতির লক্ষ্যে সুশৃংখল অনুসন্ধান বা পর্যালোচনা, যা উদ্ধৃতি প্রকাশ ও প্রচারের মাধ্যমে সম্পন্ন হয় তা হল গবেষণা। জন. ডব্লিউ বেস্ট এর মতে গবেষণা হলো বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির প্রয়োগ দ্বারা বিশ্লেষণের আরো আনুষ্টানিক সুসংবদ্ধ ও ব্যাপক প্রক্রিয়া। রিচার্ডের মতে গবেষণা হলো সাধারণভাবে প্রয়োগযোগ্য নতুন জ্ঞান, যা সৃষ্টি করতে স্বীকৃত বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি ব্যবহৃত হয়।
গবেষণা সম্পর্কে উপরুক্ত সংজ্ঞাগুলো বিশ্লেষণ করলে এটা বলা যায় গবেষণা গবেষকের মৌলিকতার স্বাক্ষর বহন করে। জ্ঞান অনুসন্ধানের মাধ্যমে স্বত্ব আবিষ্কার করায় যে কোনো গবেষণার লক্ষ্য। তাই অনেকে মনে করেন যে যা সকলের কাছে অজানা তা জানার নাম গবেষণা নয়। বরং যে বিষয়ে সকলের কম বেশি জ্ঞান রয়েছে সেই বিষয়ে সম্যক জ্ঞান লাভের পদ্ধতি হলো গবেষণা। অবশেষে গবেষণার অর্থ সম্পর্কে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাবনার সঙ্গে একমত হয় বলা যেতেই পারে আমরা “জানার মাঝে অজানার সন্ধান করছি”।
গবেষণার প্রকৃতি (Nature of Research):
উদ্দেশ্যগত ভাবে যে কোনো গবেষণাই নতুন জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমে উপস্থিত জ্ঞানকে সমৃদ্ধ করতে আগ্রহী করে তোলে। এর পিছনে কাজ করে গবেষকের অনুসন্ধিৎসু মন এবং সমস্যা সমাধানের পথ নির্দেশ উদ্ভাবনের প্রত্যশা। কিন্তু বাস্তব ক্ষেত্রে গবেষণালব্ধ ফলকে বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখা হয়। গবেষণার প্রকৃতি হল:
১) গবেষণা হয় ধারাবাহিক ও সুশৃংখল।
২) গবেষককে হতে হয় সাহসী ও নিরপেক্ষ। গবেষণার তথ্যাদি সমাজের প্রচলিত নিয়মের বাইরে যায় তা হলেও তা প্রকাশে সাহস থাকা দরকার।
৩) গবেষককে সকল ধরনের আবেগ বর্জিতের মাধ্যমে কাজ সম্পাদন করতে হয়।
৪) গবেষণা একটি সময় – সাপেক্ষ , ব্যায়-বহুল ও শ্রম-স্বপেক্ষ বিষয়।
৫) অভিজ্ঞতা সম্পন্ন নির্দেশকের দ্বারা গবেষককে চালিত হতে হয়। অন্যথায় মূল উদ্দেশ্য ব্যহত হয।
৬) গবেষণার উপর গবেষণা করে নতুন নতুনতত্ত্ব ও তথ্য আবিষ্কার হয় ।
গবেষকের মুখ্য উদ্দেশ্য হল অনুসন্ধানের মাধ্যমে মানবিক আচরন এবং সমাজ জীবন সম্পর্কে উপলব্ধি করে সামগ্রিক নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা। আপাত দৃষ্টিতে মানুষের সামাজিক জীবন জটিল এবং ভিন্নধর্মী হলেও অন্তনির্হিত সামঞ্জস্য এবং শৃঙ্খলার ধারনাই সামাজিক গবেষণার সোপান।
গবেষনার বৈশিষ্ট
একটি ভালো গবেষণার কিছু মৌলিক বৈশিষ্ট্য থাকে। যেহেতু গবেষণার মাধ্যমে সত্যকে অনুসন্ধান করা হয় , তাই যাতে প্রকৃত সত্যকে খুঁজে পাওয়া যায় তার জন্য গবেষককে সুশৃংখল পদ্ধতিতে প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করতে হয়। ভালো গবেষণার বৈশিষ্ট্য গুলি হল:
১) ভালো গবেষণা রীতিবদ্ধ (Good research is systematic) : একটি ভালো গবেষণা হল নতুন ঘটনা উদঘাটনের একটি নিয়মতান্ত্রিক পদ্ধতি এক্ষেত্রে বৈজ্ঞানিক কলা – কৌশল প্রয়োগের মাধ্যমে প্রশ্ন জিজ্ঞাসা ও অনুসন্ধানের প্রক্রিয়া সম্পন্নকরা হয়। অর্থাৎ ভালো গবেষনা একটি রীতিবদ্ধ অনুসন্ধান প্রক্রিয়া ।
২) ভালো গবেষনা যৌক্তিক (Good research is logical) : একটি ভালো গবেষণা যৌক্তিক ভাবে সংগতিপূর্ন ও অর্থপূর্ন হয়। এক্ষেত্রে অনুসন্ধান প্রক্রিয়ার যৌক্তিক অনুসিদ্ধান্ত গঠনকরা হয়এবং এই অনুসন্ধান গুলির বাস্তব ঘটনা বা তথ্যের সাহায্যে যৌক্তিকতা যাচাই করা হয়। কোনো গবেষণায় ব্যবহৃত ধারনা যদি বাস্তব জগতের কোনো তথ্যকে নির্দেশ না করে তাহলে তা মুল্যহীনহবে। তাই ভালো গবেষণা যৌক্তিক হয় ।
৩) ভালো গবেষনা অভিজ্ঞতালব্ধ (Good research is empirical) : অভিজ্ঞতালদ্ধ পর্যবেক্ষনের মাধ্যমে প্রাপ্ত তথ্যই একটি ভালো গবেষণায় ব্যবহৃত হয়। এ গবেষনা অতিপ্রাকৃতিক বিষয়ের সাথে সম্পর্ক যুক্ত নয় বা অনুমান নির্ভরও নয়। বাস্তবতা ভিত্তিক ও অভিজ্ঞতালব্ধ তথ্যই ভালো গবেষণার প্রান স্বরূপ। বাস্তবতার সাথে সম্পর্কহীন বিষয় ভালো গবেষণার উপজীব্য হতে পারে না।
৪) ভালো গবেষণা পুনরাবৃত্তি মূলক (Good Research is Replicable) : ভালো গবেষণার অন্যতম হল বৈশিষ্ট্য পুনরাবৃত্তি । অনেক ক্ষেত্রে ভালো গবেষণার মাধ্যমে যে বিষয়টি বা সিদ্ধান্তটি বেড়িয়ে আসে তা পূর্বের কোনো গবেষণার বিষযের বা সিদ্ধান্তের মত পুনরাবৃত্তি হতে পারে। অর্থাৎ পুনরাবৃত্তি ভালো গবেষণার অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
সার্বিকভাবে এখন গবেষণার কতগুলি সাধারণ বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করা যেতে পারে। গবেষণার সাধারণ বৈশিষ্ট্য গুলি হল –
- গবেষণা হলো একটি মৌলিক কাজ।
- সাধারণত একটি নির্দিষ্ট বিষয়কে কেন্দ্র করে গবেষণা কার্য পরিচালিত হয়।
- কোন নির্দিষ্ট বিশেষ দর্শন দৃষ্টিভঙ্গি বা মতবাদের দ্বারা প্রভাবিত না হয়ে খোলা মনে গবেষণায় আত্মনিয়োগ করতে হয়।
- গবেষণার মান নির্ভর করে গবেষকের কৌতুহলী ও অনুসন্ধিতসু দৃষ্টিভঙ্গির উপর।
- গবেষণার ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় বিষয় সংক্রান্ত প্রতিটির নির্দেশক ও তথ্য কে নির্দিষ্ট নিয়ম নীতি অনুযায়ী গ্রহণ করতে হয় এবং সেই সকল তথ্যের প্রাসঙ্গিক প্রয়োগের প্রতি গুরুত্ব দিতে হয়।
- কোন বিষয়ে নতুন কোন নীতি বা সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া এবং সেই সিদ্ধান্তের সাধারণীকরণ হলো গবেষণার অন্যতম উদ্দেশ্য।
- গবেষণা যেহেতু একটি বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি তাই এর মূল ভিত্তি যুক্তি পরিমাপ বা পরিসংখ্যানগত উপস্থাপনার ওপর নির্ভরশীল।
- গবেষণা হলো কারণ ও তার ফলাফল অর্থাৎ অনুসন্ধান ও সিদ্ধান্তের এক সম্মিলিত গঠন পদ্ধতি।
- গবেষণা হলো গবেষকের জ্ঞান ও বুদ্ধির সচেতন প্রয়োগ ও প্রকাশ।
- গবেষণা পর্যবেক্ষণযোগ্য অভিজ্ঞতা ও পরীক্ষালব্ধ স্বার্থের উপর প্রতিষ্ঠিত এবং এর জন্য প্রয়োজন নির্ভুল পর্যবেক্ষণ ও বর্ণনা এর জন্য দরকার দক্ষতা।
- গবেষণা একটি সময় সাপেক্ষ ব্যয়বহুল এবং শ্রম সাপেক্ষ বিষয়ে গবেষণার কাজ তাই ব্যাপক উৎসাহ ও ধৈর্যের সাথে করতে হয়।
- গবেষণার উদ্দেশ্য ও প্রয়োজনীয়তা স্পষ্টভাবে বর্ণিত হয় এবং এক সহজ ধারণা দেওয়া হয়
- গবেষণা নকশা হবে সুপরিকল্পিত যাতে প্রাপ্ত ফলাফল যতটা সম্ভব নৈর্ব্যক্তিক হয়
- গবেষণার মাধ্যমে প্রাপ্ত তথ্যের মাধ্যমে নতুন কিছু জানার সুযোগ সৃষ্টি হয়।
- গবেষণা শুধু তথ্যের লিপিবদ্ধকরণ নয় বরং তা হল অনুমিত সিদ্ধান্ত গ্রহণ সংগৃহীত তথ্যের বিন্যাস এবং বিশ্লেষণ করার মতো কাজ করার যোগ্যতা থাকা।
- গবেষণা নতুন জ্ঞানের সন্ধান দেয়, যা ইতিপূর্বে ভাবাই হয় না।
গবেষনার প্রকারভেদ
উদ্দেশ্য, গভীরতা, বিশ্লেষণ, সময়, উপাত্ত ইত্যাদির ওপর ভিত্তি করে গবেষণা বিভিন্ন রকমের হতে পারে, নিম্নে এগুলো উল্লেখ করা হলো –
- উদ্দেশ্য অনুসারে গবেষণা দুই প্রকার –
ক. তাত্ত্বিক গবেষণা (Theoretical Research): যে পদ্ধতিগত অনুসন্ধান প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ব্যবহারিক প্রয়োগ নির্বিশেষে নতুন জ্ঞান সৃষ্টি করা হয় তাকে তাত্ত্বিক গবেষণা বলে। তাত্ত্বিক গবেষণাকে বিশুদ্ধ গবেষণা (Pure Research), মৌলিক গবেষণা (Fundamental Research), প্রাথমিক গবেষণা (Primary Research) নামে চিহ্নিত করা হয়। তাত্ত্বিক গবেষণা বা মৌলিক গবেষণার উদ্দেশ্য হলো নতুন জ্ঞান সৃষ্টি করা।
যে ক্ষেত্রে কখনো গবেষণা হয়নি সে ক্ষেত্রে গবেষণা পরিচালনা করা অথবা পূর্বে গবেষণা করা হয়েছে কিন্তু সেখানে বিশেষ পরিবর্তন বা নতুন কিছু সংযোজনের জন্য যে গবেষণা পরিচালিত হয় তা হলো মৌলিক গবেষণা বা তাত্ত্বিক গবেষণা।
খ. ফলিত গবেষণা (Applied Research): যে গবেষণার মাধ্যমে তাত্ত্বিক বা মৌলিক গবেষণা থেকে প্রাপ্ত জ্ঞানকে বাস্তবক্ষেত্রে প্রয়োগের উপায় খুঁজে বের করার চেষ্টা করা হয় তা হলো ফলিত গবেষণা। ফলিত গবেষণার উদ্দেশ্য হলো তাত্ত্বিক গবেষণা বা মৌলিক গবেষণালব্ধ জ্ঞানের বাস্তবিক প্রয়োগ।
মূলত ফলিত গবেষনা বা applied research কে দুই ভাগে পৃথক করা যায় –
- প্রযুক্তি বিষয়ক ফলিত গবেষণা : প্রযুক্তিবিষয়ক ফলিত গবেষণা সাধারণত যন্ত্র, যন্ত্রপাতি ও যন্ত্রাংশ সম্পর্কিত হয়ে থাকে। উৎপাদনমুখী কাজে কীভাবে প্রযুক্তির ব্যবহার করা যায় বা ত্রুটিমুক্তভাবে প্রযুক্তির ব্যবহার কীভাবে বৃদ্ধি করা যায় ইত্যাদি উদ্দেশ্য নিয়ে যে ফলিত গবেষণা পরিচালিত হয় তাকে প্রযুক্তিবিষয়ক ফলিত গবেষণা বলে।
- বৈজ্ঞানিক ফলিত গবেষণা : বৈজ্ঞানিক ফলিত গবেষণা পরিচালিত হয় পূর্বানুমানের ভিত্তিতে। যে ফলিত গবেষণার উদ্দেশ্য হলো কোনো বিশেষ জিনিসের (পণ্য বা যে-কোনো কিছু) ব্যবহার উপযোগিতা এবং পরিবর্তনশীলতা নির্ণয় করা তা হলো বৈজ্ঞানিক ফলিত গবেষণা।
- গভীরতা ও ক্ষেত্র অনুসারে গবেষনা সাধারনত চার প্রকার –
ক. অনুসন্ধানী গবেষণা বা অন্বেষণমূলক (Exploratory Research) : পূর্বের কোনো গবেষণা হতে প্রাপ্ত জ্ঞান স্পষ্টভাবে বোঝা না গেলে বা তা সঠিকভাবে ব্যবহার করতে না পারলে, ওই বিষয় বা জ্ঞানের ওপর স্পষ্ট ধারণা অর্জন ও তার সঠিক ব্যবহার জানার জন্য যে পদ্ধতিগত বিজ্ঞানভিত্তিক ধারাবাহিক অনুসন্ধান প্রক্রিয়া পরিচালিত হয় তাকে অনুসন্ধানী গবেষণা বলে। কোনো বিষয়ের ওপর পূর্বে পর্যাপ্ত গবেষণা পরিচালিত না হলেও সেক্ষেত্রে অনুসন্ধানী গবেষণা করা যায়। অনুসন্ধানী গবেষণা অনেকাংশেই তত্ত্ব ও সংগৃহীত নির্ভর হয়ে থাকে।
খ. বর্ণনামূলক গবেষণা (Descriptive Research) : সমাজবিজ্ঞান গবেষণা শাখায় বহুল পরিচিতি একটি গবেষণা হলো বর্ণনামূলক গবেষণা। এতে নির্দিষ্ট সময়, ঘটনা, বিশ্বাস, প্রবণতা, প্রতিক্রিয়া, দৃষ্টিভঙ্গি ইত্যাদি বিষয়ের ওপর বর্ণনা করা হয়। এ ধরণের গবেষণায় অনেক সময় পর্যাপ্ত উপাত্ত সংগ্রহ এবং অনুসন্ধান বা তদন্ত না করেই ফলাফল প্রদান করা হয়।
বর্ণনামূলক গবেষনাকে আবার ৩টি ভাগে পৃথক করা যেতে পারে। সেগুলি যথাক্রমে – ক) পরিমাপগত গবেষনা, খ) কেস স্টাডি, গ) কর্মসহায়ক গবেষনা।
গ. ব্যাখ্যামূলক গবেষণা (Explanatory Research) : বর্ণনামূলক গবেষণাকে ভিত্তি করেই ব্যাখ্যামূলক গবেষণার উৎপত্তি। বর্ণনা এই গবেষণার প্রধানতম বৈশিষ্ট্য হলেও ব্যাখ্যাকে প্রাধান্য দেওয়া হয়। আধুনিক গবেষণায় যত পদ্ধতির বা যত প্রকারের গবেষণা প্রচলিত, সে সবের মধ্যে বর্ণণামূলক গবেষণা অন্যতম। যে গবেষণার মাধ্যমে কোনো কিছু গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করে কারণ ও প্রভাব (cause-and-effect) সম্পর্কে বিস্তারিত ব্যাখ্যার মাধ্যমে প্রকাশ করা হয় তাকে ব্যাখ্যামূলক গবেষণা বলে।
ঘ. সম্পর্কযুক্ত গবেষণা (Correlational Research) : যে বৈজ্ঞানিক গবেষণার মাধ্যমে একাধিক চলকের মধ্যে সম্পর্ক চিহ্নিত করা হয় তা হলো সম্পর্কযুক্ত বা কোরিলেশনাল গবেষণা (Correlational Research) ।
- ব্যবহৃত উপাত্ত অনুসারে গবেষনা সাধারন তিন ধরনের। যথা –
ক. গুণগত গবেষণা (Qualitative Research) : গুণগত গবেষণা সামাজিক বিজ্ঞান গবেষণা ধারার সম্ভবত সবচেয়ে জনপ্রিয় পদ্ধতি। যে গবেষণায় প্রয়োজনীয় উপাত্ত সরাসরি (first-hand) পর্যবেক্ষণ, সাক্ষাৎকার, প্রশ্নমালা, ফোকাস গ্রুপ আলোচনা ইত্যাদি পদ্ধতির মাধ্যমে সংগ্রহ করে তা ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করা হয় যার সব ই অগাণিতিক তাকে গুণগত গবেষণা বলে। গুণগত গবেষণা করা হয় কোনো কিছু সম্পর্কে জানতে, তুলনা করতে বা কখনো কখনো সম্পর্ক নির্ণয়ের জন্য। গুণগত গবেষণার ফলাফল গাণিতিক উপায়ে বা পরিসংখ্যানে প্রকাশ করা যায় না।
খ. পরিমাণগত গবেষণা (Quantitative Research) : যে গবেষণায় ব্যবহৃত উপাত্ত সবসময় সংখ্যাসূচক হয় এবং গাণিতিক ও পরিসাংখ্যিক পদ্ধতি ব্যবহার করে ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করা হয় তা হলো পরিমাণগত গবেষণা। একে সংখ্যাত্বক গবেষণাও বলে। এই গবেষণার একটি রুপ হলো জরিপ গবেষণা, যা বর্ণনামূলক গবেষণারও অন্তর্ভুক্ত।
গ. মিশ্র গবেষণা (Mixed-method Research) : যখন কোনো গবেষণায় গুণগত ও পরিমাণগত উভয় প্রকারের উপাত্ত ব্যবহার করে ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের মাধ্যমে সমস্যার সমাধান অনুসন্ধান করা হয় তা হলো মিশ্র পদ্ধতির গবেষণা। মিশ্র গবেষণার উপাত্ত- ও ফলাফল গাণিতিক ও অগাণিতিক।
- চলকের ব্যবহার ও ব্যবহারের মাত্রার ওপর ভিত্তি করে পরিচালিত গবেষণা তিন প্রকারের। যথা-
ক. পরীক্ষণমূলক গবেষণা (Experimental Research) : নিয়ন্ত্রিত পর্যবেক্ষণ হলো পরীক্ষণ। যে গবেষণায় বিশেষ কোনো উদ্দেশ্য নিয়ে কৃত্রিম পরিবেশ সৃষ্টি করে সেখানে কঠোর নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে পর্যবেক্ষণ করে চলকের বৈশিষ্ট্য ও এক চলকের প্রতি অন্য চলকের প্রভাব নির্ণয় করা হয় তাকে পরীক্ষণমূলক গবেষণা বা পরীক্ষামূলক গবেষণা বলে।
খ. অ-পরীক্ষণমূলক গবেষণা (Non-experimental Research) : অ-পরীক্ষণমূলক গবেষণা পর্যবেক্ষণমূলক গবেষণা হিসেবেও পরিচিত, তবে এই পর্যবেক্ষণ কোনো নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে সম্পাদন হয় না। যে গবেষণার মাধ্যমে কোনো চলকের ওপর পর্যবেক্ষণ করে তার স্বরূপ বা বৈশিষ্ট্য চিহ্নিত করার চেষ্টা করা হয় কিন্তু গবেষকের সরাসরি হতক্ষেপ থাকে না তাকে অ-পরীক্ষণমূলক গবেষণা বলে।
গ. অর্ধ-পরীক্ষণমূলক গবেষণা (Quasi-Experimental Research) : বাস্তবেক্ষেত্রে পরীক্ষণমূলক গবেষণা পরিচালনা যখন অসম্ভব বলে মনে করা হয় তখন দ্বৈবচয়নের ওপর ভিত্তি না করে সমগ্রক থেকে বাছাই করে কয়েকটি দল গঠন করে প্রতিবন্ধকতা এড়িয়ে যে নকশা প্রণয়ন করে যৌক্তিক মীমাংসায় পৌঁছানোর চেষ্টা করা হয় তা হলো অর্থ-পরীক্ষণমূলক গবেষণা বা আপাত-পরীক্ষণমূলক গবেষণা।
- গবেষনায় অনুমান ও এর শ্রেণিবিন্যাস অনুসারে গবেষনা তিন প্রকার। যথা –
ক. অবরোহী গবেষণা (Deductive Investigation) : পূর্বে ঘটে যাওয়া কোনো ঘটনা থেকে বা বিবৃতি থেকে সমগ্রকের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অংশ সম্পর্কে ধারণা গঠন করা হয় তখন তাকে অবরোহী পদ্ধতির গবেষণা বলে। অবরোহী পদ্ধতি হলো সূত্র থেকে উদাহরণ গঠনের প্রক্রিয়া।
খ. আরোহী গবেষণা (Inductive Research) : উদাহরণ থেকে সূত্র গঠন প্রক্রিয়া হলো আরোহী পদ্ধতি। সমগ্রকের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অংশকে পর্যবেক্ষণ করে বা সূত্র হতে প্রাপ্ত ফলাফলের ওপর ভিত্তি করে একটি সাধারণ সিদ্ধান্তে উপনিত হওয়ার সাথে জড়িত গবেষণাকে বলা হয় আরোহী গবেষণা।
গ. অনুসিদ্ধান্তমূলক অবরোহী গবেষণা (Hypothetical-Deductive Research) : যে গবেষণায় প্রথমে সত্যকে পর্যবেক্ষণ করে একটি অনুসিদ্ধান্তে আসা হয় এবং এর পরে অবরোহী পদ্ধতি প্রয়োগ করে যে ফলাফল আসে তা অভিজ্ঞতার আলোকে ব্যাখ্যা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় তাকে অনুসিদ্ধান্তমূলক অবরোহী গবেষণা বলে।
- অতিবাহিত সময় অনুসারে গবেষনা সাধারনত দুই প্রকার –
ক. অনুদৈর্ঘ্য গবেষণা (Longitudinal Study) : অনুদৈর্ঘ্য গবেষণা হলো একই চলককে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বারবার পর্যবেক্ষণ ও পরীক্ষার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া। এর আরেক নাম প্যানেল স্টাডি (Panel Study) ।
খ. ক্রস-সেকশনাল স্টাডি (Cross-Sectional Study) : নির্ধারিত বা নির্দিষ্ট কোনো সময়ের মধ্যে কোনো ঘটনা, ব্যক্তি বা সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলির সামষ্টিক পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে যে অনুসন্ধান প্রক্রিয়া পরিচালিত হয় তা হলো ক্রস-সেকশনাল স্টাডি।
- তথ্যের উৎস অনুসারে গবেষণা সাধারনত দুই প্রকার
ক. প্রাথমিক গবেষণা (Primary Research) : সরাসরি উৎস থেকে উপাত্ত সংগ্রহ করে যে গবেষণা পরিচালনা করা হয় তা হলো প্রাথমিক গবেষণা বা মৌলিক গবেষণা। তাত্ত্বিক গবেষণার মতোই এই গবেষণা পরিচালিত হয়। প্রাথমিক উৎস থেকে এই গবেষণার উপাত্ত ও সংগৃহীত হয় এবং তা ফার্স্ট-হ্যান্ড (first-hand) হয়ে থাকে।
খ. সেকেন্ডারি গবেষণা (Secondary Research) : মাধ্যমিক গবেষণা প্রাথমিক গবেষণার ঠিক বিপরীত। যে অনুসন্ধান প্রক্রিয়ায় কোনো উদ্দেশ্যকে কেন্দ্র করে বিজ্ঞানভিত্তিক পদ্ধতিতে মাধ্যমিক উৎস যেমন- সাময়িকী, গবেষণাপত্র, সংবাদপত্র, নথি, চিত্র, প্রতিবেদন ইত্যাদি থেকে উপাত্ত নিয়ে ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করে সিদ্ধান্তে পৌঁছানো হয় তা হলো মাধ্যমিক গবেষণা।
উপসংহারঃ
নতুন জ্ঞানের পরিধি বৃদ্ধি করার জন্য বা বিদ্যমান জ্ঞানের সীমা বাড়ানোর লক্ষ্যে যে কোনো গবেষণা, তা পর্যবেক্ষণ বা অন্য কোনো পদ্ধতির মাধ্যমে হতে পারে, তাকে গবেষণা বলে। যেখানে বৈজ্ঞানিক গবেষণা হল প্রাকৃতিক ঘটনা সম্পর্কে একটি পদ্ধতিগত এবং সমালোচনামূলক তদন্ত যা বর্ণনা, ব্যাখ্যা এবং অবশেষে তাদের মধ্যে সম্পর্ক বোঝার জন্য।
বৈজ্ঞানিক গবেষণা তথ্য দিয়ে শুরু হয় এবং তারপর তত্ত্বের দিকে চলে যায়। তত্ত্বকে “আন্তঃসম্পর্কিত গঠন (ধারণা), সংজ্ঞা এবং প্রস্তাবনাগুলির একটি সেট হিসাবে সংজ্ঞায়িত করা যেতে পারে যা ঘটনাটির ভবিষ্যদ্বাণী এবং ব্যাখ্যা করার উদ্দেশ্যে ভেরিয়েবলের মধ্যে সম্পর্ক নির্দিষ্ট করে একটি ঘটনার একটি পদ্ধতিগত দৃষ্টিভঙ্গি উপস্থাপন করে।
বিজ্ঞানের বিকাশে একটি তত্ত্ব দ্বারা পরিবেশিত হওয়ার জন্য বেশ কয়েকটি উদ্দেশ্য রয়েছে। প্রথমত, তত্ত্ব একটি নির্দিষ্ট এলাকায় বিদ্যমান জ্ঞানকে সংক্ষিপ্ত করে এবং ক্রমানুসারে রাখে। দ্বিতীয়ত, তত্ত্ব পর্যবেক্ষণকৃত ঘটনা এবং সম্পর্কের জন্য একটি অস্থায়ী ব্যাখ্যা প্রদান করে। সবশেষে, তত্ত্ব ঘটনা সংঘটনের ভবিষ্যদ্বাণী করার অনুমতি দেয় এবং তদন্তকারীকে অনুমান করতে এবং অবশেষে, এখন পর্যন্ত অজানা ঘটনা আবিষ্কার করতে সক্ষম করে।
বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি তিনটি মৌলিক ধাপ নিয়ে গঠিত; পদ্ধতিগত পর্যবেক্ষণ, শ্রেণীবিভাগ এবং তথ্য ব্যাখ্যা. আমরা গবেষণা অধ্যয়নকে এর উদ্দেশ্য অনুসারে নিম্নলিখিত বিভাগগুলিতে শ্রেণীবদ্ধ করতে পারি: অনুসন্ধানমূলক বা গঠনমূলক গবেষণা, বর্ণনামূলক গবেষণা, ডায়াগনস্টিক গবেষণা এবং মূল্যায়নমূলক গবেষণা।
যেকোনো গবেষণার প্রধান বৈশিষ্ট্য হল বস্তুনিষ্ঠতা, নির্ভুলতা, নকশা এবং যাচাইযোগ্যতা। ব্যাপকভাবে, গবেষণা অধ্যয়ন দুই ধরনের হয়; মৌলিক বা মৌলিক গবেষণা এবং ফলিত গবেষণা। মৌলিক বা মৌলিক গবেষণার প্রধান লক্ষ্য ব্যবহারিক প্রয়োগের কোনো অভিপ্রায় ছাড়াই জ্ঞানের সীমানা প্রসারিত করা। ফলিত গবেষণা একটি তাৎক্ষণিক, নির্দিষ্ট এবং বাস্তব সমস্যার সমাধানের দিকে পরিচালিত হয়।
