ভূমিকা: সামাজিক বিজ্ঞানীদের জন্য গবেষণার বহু বিষয় রয়েছে। যে কোনো সামাজিক পরিবেশ, পারিপার্শ্বিকতা বা বিষয়বস্তু বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান বা গবেষণার সম্ভাব্য ক্ষেত্র হতে পারে। একজন গবেষক একটি সমস্যাকে বাছাই করে তার উপর গবেষণা কর্ম পরিচালনা করেন। সকল গবেষণা আবার একই উদ্দেশ্যে পরিচালিত হয় না। গবেষণার উদ্দেশ্যে ভিত্তিতে চলকগুলোর সংজ্ঞায়ন, পরিমাপ ও প্রয়োজনবোধে অনুকল্প নির্মিত হবার পর একজন গবেষক কে একটি গবেষণা নকশা গঠন করতে হয়, যা মূলত গবেষণা সম্পর্কিত কিছু মৌলিক প্রশ্নের সমাধান দেয়। যেমন – একজন গবেষক কাদের উপর গবেষণা করবেন? কতজনের উপর করবেন? কি পর্যবেক্ষণ করবেন? কখন পর্যবেক্ষণ করবেন? কিভাবে উপাত্ত সংগ্রহ করবেন ইত্যাদি।
গবেষণা নকশা কি (What is Research Design)?
গবেষণা নকশা হলো গবেষণাকর্ম বাস্তবায়নের একটি প্রস্তাবিত পরিকল্পনা বা নীল নকশা। গবেষণা নকশা হল গবেষণা কর্মের একটি প্রস্তাবিত কর্মসূচি যা গবেষককে উপাত্ত সংগ্রহ, বিশ্লেষণ ও ব্যাখ্যা এবং অনুসন্ধানের অন্তর্ভুক্ত চলক সমূহের মধ্যে বিদ্যমান কার্যকারণ সম্পর্কিত সিদ্ধান্ত গ্রহণের দিক নির্দেশনা প্রদান করে। বিভিন্ন লেখক বিভিন্ন ভাবে গবেষণা নকশার সংজ্ঞা প্রদান করেছেন। যেমন –
পি .ভি. ইয়ং এর মতে “a research design is the logical and symmetric planning and directing of a piece of research.” অর্থাৎ গবেষণা নকশা গবেষণা কর্মের যৌক্তিক এবং পদ্ধতিগত পরিকল্পনা এবং নির্দেশনা।
Fred. N. Kerlinger বলেন ” গবেষণা নকশা হচ্ছে গবেষণা প্রশ্নের উত্তর পাওয়া ও অমিল নিয়ন্ত্রণ করার জন্য পরিকল্পনা, কাঠামো ও কৌশল বিশ্লেষণ।”
C.R. Kothari এর ভাষায় “The research design is the conceptual structure within which research is conduced and measurement and analysis of data.” অর্থাৎ গবেষণা নকশা একটি প্রত্যয়গত কাঠামো যার ভিতর গবেষণা পরিচালনা ও পরিমাপ করা হয় এবং উপাত্ত বিশ্লেষণ করা হয়।
Sterhing এর মতে, “A research design is a plan of the proposed work in which hypothesis or hypothesis have been properly formed.” অর্থাৎ গবেষণা নকশা প্রস্তাবিত কাজের একটা পরিকল্পনা যেখানে অনুকম্প যথাযথভাবে গঠন করা হয়।
সুতরাং বলা যায়, গবেষণা নকশা হল গবেষণা বাস্তবায়নের একটি যৌক্তিক ও সুসংবদ্ধ পরিকল্পনা যার দ্বারা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সুষ্ঠু ও যথার্থ পদ্ধতি প্রয়োগ করে গবেষণার লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব। প্রকৃতপক্ষে গবেষণা নকশা একজন গবেষককে গবেষণাধীন সমস্যার পর্যবেক্ষণ ও প্রত্যয়িকরনের গঠনের নিয়মকে নির্দেশ করে।
গবেষণা নকশার প্রকারভেদ ও প্রায়োগিক পদ্ধতি (Types of Research Design)
গবেষণা নকশা প্রধানত তিন ধরনের হয়ে থাকে। যথা:
- অনুসন্ধানমূলক
- বর্ণনামূলক
- ব্যাখ্যামূলক
উপরোক্ত তিনটি গবেষণা নকশার রয়েছে তিনটি মৌলিক প্রায়োগিক পদ্ধতি। যেমন:
- কেস স্টাডি
- জরিপ
- পরীক্ষণ
অনুসন্ধানমূলক ও বর্ণনামূলক গবেষণা নকশার ক্ষেত্রে কেস স্টাডি ও জরিপ পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়। কিন্তু ব্যাখ্যা মূলক গবেষণা নকশায় জরিপ ও পরীক্ষণ পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়। এ তিনটি মৌলিক গবেষণা নকশা সামাজিক বিজ্ঞানের সব ধরনের সমস্যাকে অধ্যায়নের জন্য পর্যাপ্ত নাও হতে পারে। সে কারণে আরও কিছু গবেষণা উদ্ভাবিত হয়েছে। সেগুলো মৌলিক গবেষণা নকশা নয়। এর প্রতিটি কোনো-না-কোনোভাবে মৌলিক গবেষণা নকশা গুলোর ভিন্ন ধরন। একজন গবেষক কোন ধরনের গবেষণা নকশা ব্যবহার করবেন তা নির্ভর করে সমস্যার প্রকৃতি, গবেষণার উদ্দেশ্য ও ধরণের উপর। তাছাড়া অর্থ, সময় ও জনবল ইত্যাদির উপর নির্ভর করে।
অনুসন্ধানমূলক গবেষণা নকশা (Exploratory Research Design)
সামাজিক গবেষণার প্রকল্প প্রণয়নের উদ্দেশ্যে প্রাথমিক ধারণা অর্জনের জন্য অনুসন্ধান মূলক গবেষণা কার্যকর ভূমিকা পালন করে থাকে। অনুসন্ধানমূলক গবেষণার ক্ষেত্রে ধারণা করা হয় যে, অনুসন্ধানের অন্তর্ভুক্ত পরিস্থিতি বা সমস্যা সম্পর্কে গবেষকের কোন ধারনা থাকে না বা সামান্য ধারণা থাকে। বিশেষ একটি গোষ্ঠী বা কোনো গবেষণা সমস্যার সাথে সাধারণ পরিচিতি একজন গবেষককে সে সমস্যার গভীরে যেতে সাহায্য করে না। অজানা বা স্বল্প পরিচিত প্রপঞ্চকে বিস্তারিত ভাবে জানার জন্য পরিচালিত হয় যা পরবর্তীতে আরও পরিশীলিত গবেষণা নকশা গঠনে গবেষককে সাহায্য করে। উদাহরণ হিসাবে বলা যেতে পারে, একজন গবেষক বাংলাদেশে বয়স্ক মানুষের সামাজিক ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা প্রদানের জন্য বয়স্ক মানুষের উপযোগী কর্মসংস্থান সৃষ্টির সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগ সম্পর্কে গবেষণা করতে চান। কিন্তু দেখা গেল গবেষকের এ ক্ষেত্রে তেমন কোন ধারণা নেই। তাই গবেষককে এর নতুন উদ্যোগ সম্পর্কে ধারণা লাভের জন্য কিংবা পরবর্তীতে এর উপর আরো সুনির্দিষ্ট গবেষণা পরিচালনার লক্ষ্যে অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য অনুসন্ধান মূলক গবেষণা পরিচালনা করতে পারেন। এ গবেষণার মাধ্যমে গবেষক জেনে নিতে পারেন যে, উদ্যোগটির প্রেক্ষাপট কি ছিল? কর্মসংস্থানের ধারণাটি কেমন? প্রাথমিকভাবে বয়স্ক জনগোষ্ঠীর কি পরিমান এই উদ্যোগের আওতায় আনা হয়েছে? এ উদ্যোগ সমাজে মানুষের প্রতিক্রিয়া কি? এ ধরনের নানা প্রশ্নের মাধ্যমে তিনি এ সম্পর্কে একটি ধারণা পেতে পারেন যা তাকে পরবর্তী গবেষণা পরিচালনার নকশা নির্ধারণে সাহায্য করবে। অনুসন্ধান গবেষণার প্রয়োজনীয়তা সবচেয়ে বেশি অনুভূত হয় যখন কোনো গবেষক গবেষণার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে চান। কিন্তু অনুসন্ধান গবেষণার বড় সমস্যা হল গবেষণা প্রশ্নগুলোর সন্তোষজনক জবাব প্রায়ই পাওয়া যায় না। তবে সন্তোষজনক জবাব খোঁজার একটি যোগসুত্র পাওয়া যায়।
বর্ণনামূলক গবেষণা নকশা (Descriptive Research Design) :
সামাজিক গবেষণার একটা গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো অনুসন্ধান ছাড়াও কোন ঘটনা বা সমস্যার মধ্যে বিভিন্ন নৈমিত্তিক সম্পর্ক সমূহের বর্ণনা করা। একজন গবেষক কোন জনগোষ্ঠীর জাতিগত ভিত্তি তাদের শারীরিক বৈশিষ্ট্য, শিক্ষাগত অবস্থা, অর্থনৈতিক ব্যবস্থা সহ বিভিন্ন বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করতে পারেন। তিনি কোন সম্প্রদায়ের সামাজিক সংগঠনগুলোর কাঠামো ও কার্যক্রম বর্ণনা করতে পারেন। বর্ণনামূলক গবেষণায় কোন ঘটনা সম্পর্কে অনুমান নির্ভর তথ্য প্রদান করা হয়। যেমন – আগামী নির্বাচনে বর্তমানে ক্ষমতাসীন দলকে বা জোটকে শতকরা কতজন লোক ভোট দেবেন? কিংবা ভারতের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি আগামী দশকে কতটুকু বৃদ্ধি পাবে ইত্যাদি। সামাজিক বিজ্ঞানের অধিকাংশই গবেষণায় বর্ণনামূলক প্রকৃতির হয়ে থাকে।
ব্যাখ্যামূলক গবেষণা নকশা (Explanatory Research Design)
গবেষণা সমস্যার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ সুস্পষ্ট গবেষণার উদ্দেশ্য এবং যথাযথ গবেষণা নকশা একজন গবেষককে সফলভাবে গবেষণা সমাপ্ত করতে একটি সুবিধাজনক বৃত্তি প্রদান করে। গবেষণাকর্ম সুষ্ঠুভাবে সম্পাদনের জন্য অনুসন্ধানমূলক ও বর্ণনামূলক গবেষণা নকশা ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। সঠিক তথ্যের অভাব রয়েছে এমন ঘটনা বা বিষয় সম্পর্কে অনুসন্ধানের মাধ্যমে স্বচ্ছ ধারণা দেওয়া ব্যাখ্যা মূলক গবেষণা নকশার মূল উদ্দেশ্য। কোন ঘটনার অনুসন্ধান ও বর্ণনার পর একজন গবেষককে যে কাজটি করতে হয় তাহলো গবেষণা অন্তর্ভুক্ত নির্ধারিত চলক গুলোর মধ্যে কার্যকারণ সম্পর্ক নির্ণয় ও ব্যাখ্যা করা। গবেষক ও উদ্দেশ্য পূরণ করেন ব্যাখ্যামূলক গবেষণা নকশার মাধ্যমে। আমাদের এটি মনে রাখতে হবে যে ভালো অনুসন্ধানমূলক ও বর্ণনামূলক অনুসন্ধান ছাড়া ভালো ব্যাখ্যামূলক গবেষণা করা যায় না। অর্থাৎ, একটি ভালো ব্যাখ্যা মূলক গবেষণা পূর্ব শর্ত হলো একটি ভালো বর্ণনামূলক অনুসন্ধান পরিচালনা করা।
যে কোন কাজ শুরু করার পূর্বে যেমন একটি পরিকল্পনার প্রয়োজন হয় সামাজিক গবেষণার ক্ষেত্রে ও তাই গবেষণা শুরু করার পূর্বে একটি পরিকল্পনার প্রয়োজন হয়। আর এ পরিকল্পনাটি হল গবেষণা নকশা। একটি উত্তম গবেষণা নকশা গবেষককে যথাসময়ে এবং যথাযথভাবে গবেষণা পরিচালনা করতে সহায়তা করে।
